সারা বাংলা

মায়ের কাছে দোয়া চেয়ে অভিযানে সেনাসদস্য তিতাস, ফিরলেন কফিনে

সন্তানের শোকে কাতর মায়ের কান্না থামছে না

প্রসেনজিৎ বিশ্বাস, ফরিদপুর: ‘মা, আগামীকাল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো।’ মায়ের সঙ্গে সেনাসদস্য তিতাস শেখের (২৮) শেষ কথা ছিল এটুকুই। ছেলে যে আর ফিরবেন না, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি মা রেখা বেগম। এখন সেই কথাই বারবার মনে পড়ছে তাঁর। সন্তানের শোকে কাতর মায়ের কান্না থামছে না।

এদিকে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারও বিলাপ করছেন। ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক বাবা আফজাল শেখের চোখ বেয়ে ঝরছে অশ্রু।

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাজা ও সামরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদপুরের নগরকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে সেনাসদস্য তিতাস শেখকে। এর আগে মা-বাবা, স্ত্রী, স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও সেনাসদস্যদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষবারের মতো গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয় তাঁর মরদেহ।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তিতাস। তাঁর মৃত্যুতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তিতাসের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে। বাবা আফজাল শেখের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। তাঁর পরিবারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাবা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। ছোট ভাই আকাশ শেখও সেনাসদস্য হিসেবে কর্মরত।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন তিতাস। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই মাসের ছুটি কাটিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে ফিরে যান তিনি।

চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় তিতাসের। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। তবে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হলো না। অভিযানে গিয়ে একটি গুলিই থামিয়ে দিল তাঁর জীবন।

স্বামীকে হারিয়ে সুমাইয়া বারবার বিলাপ করে বলছেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’

মা রেখা বেগমের ভাষ্য, গত বুধবার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। তখন তিতাস তাঁকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (গতকাল বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের সেই কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে তাঁর। কিন্তু সেটিই যে শেষ কথা হবে, তা বুঝতে পারেননি মা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে আহত হন তিতাস। তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে। পরে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আজ বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দা উপজেলা সদরের মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।

মাগরিবের নামাজের পর সেখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হলে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

দাফনের পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তিতাসকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে সাতজন সেনাসদস্য তিন দফায় ২১টি গুলি ছুড়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানান।

জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তিতাসের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার। ভাগনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে আর কারও সন্তানকে এভাবে প্রাণ দিতে না হয়। কারও মায়ের বুক যেন খালি না হয়।’

এ সময় বক্তব্য দেন রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পের ১ বীর ইউনিটের ক্যাপ্টেন সাজিদ, নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সামদানি রাসুল আযাদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button