সাভারের ট্যানারি বর্জ্য রূপান্তর হচ্ছে রপ্তানিমুখী মূল্যবান পণ্যে
পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত কঠিন রাসায়নিক বর্জ্য এখন উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত
তাজা খবর: ঢাকা জেলার সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত কঠিন রাসায়নিক বর্জ্য এখন উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণকারী এসব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ওষুধ শিল্পের উপযোগী জেলটিন ও চামড়া নরম করার কাজে ব্যবহৃত শিল্প প্রোটিন পাউডার উৎপাদিত হচ্ছে। চীনের ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপের প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে দেশে প্রতিষ্ঠিত দুটি কারখানা এই সম্ভাবনাময় খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
কারখানা ও উৎপাদন কার্যক্রম
সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কাছে ওয়েনঝো ইউয়ানফেই ও পিংইয়াং গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত ‘বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড’ এবং ২০২৪ সালে নিবন্ধিত শতভাগ রপ্তানিমুখী ‘ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড’ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কারখানা দুটিতে কাঁচামাল হিসেবে সাভার শিল্পনগরী থেকে সংগৃহীত ওয়েট ব্লু ডাস্ট, চামড়ার ছাঁট ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে কারখানা দুটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার টন ট্যানারি বর্জ্য রিসাইকেল করছে এবং এতে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) সমৃদ্ধ বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানির বার্ষিক জেলটিন উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার টন, আন্তর্জাতিক বাজারে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি ট্যানারির বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক চুক্তি করা হয়েছে।
গত বছর থেকে শুরু হওয়া কার্যক্রমে ইতোমধ্যে চীন ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের জেলটিন এবং ৩ লাখ ডলারের শিল্প প্রোটিন পাউডার। সম্প্রতি হংকং থেকেও ৪ লাখ ডলারের জেলটিনের নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ও সনদ সম্পন্ন করার পর তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এসব পণ্য রপ্তানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আমদানি নির্ভরতা হ্রাস
জেলটিন প্রধানত ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে এবং শিল্প প্রোটিন পাউডার প্রক্রিয়াজাত চামড়াকে নরম করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এসব কাঁচামালের জন্য স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জেলটিন এবং ১ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের খালি ক্যাপসুলের আবরণ আমদানি করেছে। ফলে দেশে এ ধরনের উৎপাদন বাড়লে তা আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখবে।
সম্ভাবনাময় এই শিল্প বর্তমানে কাঁচামালের তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। বছরে ৫ হাজার টন জেলটিন উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩০ হাজার টন গরুর কাঁচা চামড়ার ছাঁট প্রয়োজন হলেও দেশে এর মোট বার্ষিক সরবরাহ মাত্র ২০ হাজার টনের মতো। এর ওপর সম্প্রতি কিছু ব্যবসায়ী এই কাঁচা ছাঁট বিদেশে রপ্তানি শুরু করায় স্থানীয় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় শিল্প ও প্রায় ৭৫ কোটি টাকার বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষায় সাভার চামড়া শিল্পনগরী থেকে গরুর চামড়ার কাঁচা ছাঁট রপ্তানি নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউএস এফডিএ নিবন্ধন, হালাল ও জিএমপি সনদ অর্জনের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে কাঁচামাল সরবরাহ সুরক্ষার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ক্যাপসুল খাতের রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রবৃদ্ধি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশ সাতটি দেশে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৬ ডলার মূল্যের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা) জেলটিনের খালি ক্যাপসুল রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭২ হাজার ৪০৮ ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৭ হাজার ১৮৯ ডলার। বছরভেদে এসব পণ্যের শীর্ষ গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, জার্মানি এবং সবশেষে মেক্সিকো।
বাজার গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, খালি ক্যাপসুলের বৈশ্বিক বাজারের আকার ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বার্ষিক ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান (নিউট্রাসিউটিক্যালস), স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ওষুধ শিল্পের গবেষণার প্রসারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব ও উচ্চমানের জেলটিনজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করছে।



