সারা বাংলা

পরিবর্তন শুধু ‘এলিট পরিসরে’ সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না: হোসেন জিল্লুর

দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষকে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে দেখতে হবে

তাজা খবর: জুলাই-পরবর্তী সময়ে পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটিই বাংলাদেশের বড় শক্তি বলে মনে করছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। এই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে কাজ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেছেন, ‘পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে শুধু ঢাকা বা ‘এলিট পরিসরের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এর জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি।’

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে পিপিআরসি আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনা সভার সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিকেন্দ্রীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তির ব্যবহার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন- সব ক্ষেত্রেই বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষকে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে দেখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, ব্যক্তির আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তনের শেষ বিচারে প্রশ্ন হলো- আমরা নিজেরা পরিবর্তিত হচ্ছি কি না এবং আমাদের আচরণ ও মূল্যবোধের উন্নয়ন হচ্ছে কি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘জুলাইয়ের আন্দোলনে যে আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশকে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মেধার বিকাশের উপযোগী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

এসময় বড় সংস্কারের পাশাপাশি ছোট সংস্কারেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘ছোট সংস্কারের দিকে নজর না দিলে বড় সংস্কার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকে।’

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘শুধু একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করলেই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না। শিক্ষক নিয়োগ কীভাবে হচ্ছে, শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে—এসব বিষয়েও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতেও একই ভাবে ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কীভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ের সংস্কার থেকে শুরু করে পরিবর্তন বিরোধী কাঠামোগত শক্তিগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ঢাকার বাইরে ও এলিট গণ্ডির বাইরের মানুষদেরও যুক্ত করতে হবে।’

হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘তরুণরা পরিবর্তনের এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ সজাগ। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের অবদান রাখার জন্য সঠিক পরিবেশ ও সঠিক সুযোগ দিতে পারছি কি না।’

সভায় বিভিন্ন খাতের তরুণ উদ্যোক্তা, সংগঠক, আইনজীবী ও গবেষণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অল্টারনেটিভসের ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটির সংগঠক তাজনুভা জাবীন বলেন, ‘জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফলাফল হলো তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হওয়া। চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও ব্যাংকারসহ যোগ্য তরুণদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

কৃষি খাতের প্রযুক্তিগত ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেন ফসলের প্রধান নির্বাহী সাকিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘কৃষকদের এখনো মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। উৎপাদিত পণ্য শেষ পর্যন্ত বাজারে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও তাদের অনিশ্চয়তা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রযুক্তি প্রায় প্রতিটি খাতকে বদলে দিলেও কৃষি খাতে সেই পরিবর্তনের গতি তুলনামূলকভাবে কম। এ ঘাটতি পূরণে তরুণদের নেতৃত্বে উদ্ভাবনের সুযোগ রয়েছে।’

কৃষি উদ্যোক্তা ও কৃষিবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা উম্মে কুলসুম পপি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি কৃষি হলেও অধিকাংশ তরুণ এ খাত থেকে দূরে থাকতে চান। বেশি আয় ও সামাজিক মর্যাদার আশায় তারা অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তরুণদের কৃষিকে ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রকৃতিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন টংডাইংনী-এর টিম লিড দও সিং নুয়ে মারমা। তিনি বলেন, ‘তরুণদের নিজেদের মধ্যে তৈরি নেটওয়ার্ক ভাষাগত বাধা দূর করার পাশাপাশি পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন কমিউনিটিতে শিক্ষা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালিকুজ্জামান বলেন, ‘কোনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে এর মূল কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হয়। ঔপনিবেশিক আমলের আইনের ধারাবাহিক উপস্থিতি কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় বাধা।’ আইন সংস্কারের কাজ তৃণমূল থেকে শুরু করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণদের ত্যাগের পাশাপাশি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা মুনীম মোবাশ্বের।

তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের জন্য জীবন দেওয়া অনেক তরুণের মধ্যেই দেশ পুনর্গঠনের দৃষ্টিভঙ্গি ও সক্ষমতা ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। পরবর্তী প্রজন্মের তরুণরা যেন শুধু জুলাইয়ের ত্যাগের জন্য স্মরণীয় হয়ে না থাকে, বরং তারা যে ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করেছে, সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়াতেও যেন তাদের জায়গা থাকে।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button