অপরাধ ও দুর্নীতি

সাভারে মাদ্রাসার ১০ ছাত্র-শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক শিশুকে ‘ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের’ অভিযোগ

টানা কয়েক দিনের ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন বাসায় অস্বাভাবিক আচরণ করছে

তাজা খবর: মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শুরু করতে না করতেই বিশাল এক ধাক্কা খেয়েছে সাত বছরের এক শিশু। সাভারের সেই মাদ্রাসার ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষকের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুটি শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি এখন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়েছে

শিশুটির পিতা সম্প্রতি ঢাকার আদালতে মাদ্রাসাটির ছাত্র ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে মামলা করেছেন।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভর্তি হওয়ার পর সপ্তাহ তিনেক না যেতেই শিশুটি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, যা চলে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত।

মামলায় অভিযোগ, মাদ্রাসার টয়লেটে প্রথম ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর এ ঘটনা জেনে শিশুটির অন্য সহপাঠীরা তাকে ধর্ষণ করে। পরে শিশুটি যেসব শিক্ষকের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে গেছেন তারাও সুযোগ নিয়ে আবার তাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করেছে। কাউকে না বলার জন্য হুমকি দিয়েছে।

টানা কয়েক দিনের ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন বাসায় অস্বাভাবিক আচরণ করছে, সারাক্ষণ কান্নাকাটি ও চিৎকার করে বলে বলেছেন তার পিতা।

জীবন গড়ার আগে একটি শিশুর জীবন যারা ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে সেসব দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ঘটনা জানতে পেরে তারা শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করিয়েছেন।

ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে গত ২৩ অগাস্ট তার বাবা মাদ্রাসাটির মুহতামিম (পরিচালক) জিয়া ইবনে কাসেমসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন।

পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি সাভার মডেল থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এ থানার এসআই সামরুল হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলার তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হলেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি

মাদ্রাসাটির মুহতামিম (পরিচালক) জিয়া ইবনে কাসেমের পাশাপাশি মামলায় আরও আসামি করা হয়েছে মাদ্রাসাটির দুই শিক্ষক, দুই হাফেজ এবং পাঁচ শিক্ষার্থীকে।

আসামির তালিকায় থাকা দুই শিক্ষক হলেন- মক্তব বিভাগের প্রধান ক্বারী রফিকুল ইসলাম (৫৬) ও সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন (২৯)। দুই হাফেজ সাব্বির (২৭) ও হাফেজ কামরুজ্জামানকেও (২৮) আসামি করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর সাভার থানা থেকে মামলার এজাহার আদালতে উপস্থাপন করা হয় ২৭ অগাস্ট। ওই দিন ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমদ তা গ্রহণ করে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেন।

আদালতে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই বাহাজ উদ্দিন বলেন, একই দিনে শিশুটি আরেক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা সুলতানা সুইটির কাছে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরেন। জবানবন্দি শেষে বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে শিশুটিকে।

মামলার এজাহারে শিশুটির সঙ্গে গা শিউরে ওঠার মত ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে মাদ্রাসার তরফে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে।

মামলার আসামিদের একজন ও মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেম অভিযোগের বিষয়ে বলেন, “আমি আসলে দেশের বাইরে ছিলাম। তাবলীগ শেষ করে ফিলিপিন্স থেকে এসেছি। মামলার বিষয়ে আমিও শুনেছি। আমাকে ১০ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

“দেখি বিষয়টা কী হয়। ওরা ছোট ছোট বাচ্চা। নিজেরা নিজেরা এগুলো করে। এখানে কোরআন, হাদিস শেখানো হয়, দ্বিনী প্রতিষ্ঠান। কেউ মাদ্রাসার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে কি না- আমরাও (সেটির) সুষ্ঠু তদন্ত চাই। প্রকৃত অপরাধী থাকলে তারা যেন বের হয়ে আসে।”

মাদ্রাসার আরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেসব শিক্ষক, হাফেজ ও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না সে বিষয়ে জানতে পরে পরিচালক জিয়াকে কয়েক দফায় ফোন করা হলে তা কেটে দেওয়া হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম বলেন, “আসামিরা শিশুটিকে এমনভাবে ধর্ষণ করেছে, তার মলদ্বারে মারাত্মক ক্ষত হয়েছে। এমন নৃশংস কাণ্ড যারা করেছে তাদের যেন দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়।”

এখনও আসামিদের কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার না করার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, তাদের গ্রেপ্তার করা না হলে তারা পালিয়ে যেতে পারেন।

শিশুটার পিতা বলেন, “মানসিকভাবে অশান্তিতে, পেরেশানিতে আছি। আমার ছেলেটা নিজ আগ্রহে বড় মাদ্রাসায় যেতে চায়। নিজ আগ্রহে ওই মাদ্রাসায় গেছে। কিন্তু সেই আগ্রহ ছিল মাত্র ২০ দিন।

তার অভিযোগ, একে একে এই ১০ আসামির বাইরেও আরও তিনজন ছেলের সঙ্গে এ কাজ করে। কাউকে বললে ওকে (শিশুটিকে) মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।

যত অভিযোগ

মামলায় অভিযোগ করা হয়, শিশুটিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি করা হয়। তার পাঠদানের সময় ফজর থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত। শিশুটির সঙ্গে তার বাবা সপ্তাহে একদিন দেখা করতেন এবং ছুটির দিন শুক্রবার বাসায় নিয়ে যেতেন। ভর্তি করানোর ২০/২১ দিন পর থেকে আসামিদের কুনজর পড়ে শিশুটির উপর; শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানো হয়।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ২১ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রোজার দিন সন্ধ্যায় টয়লেটে ২০ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থীর প্রথম ধর্ষণের শিকার হয় সাত বছরের শিশুটি। কান্নাকাটি করলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।

দীর্ঘ এজাহারে এরপর একে একে সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন চালানোর বর্ণনা দেওয়া হয়। ধর্ষণের ঘটনা শুনে আরেক শিক্ষার্থী প্রথম ঘটনার পাঁচ দিন পর তাকে ধর্ষণ করে। এভাবেই ৬ জুলাই পর্যন্ত ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। আসামির তালিকায় নাম থাকা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে ঘটনার বিষয়ে জানাতে গিয়ে উল্টো আবার নির্যাতনের শিকার হয়েছে শিশুটি।

এদিকে মাদ্রাসায় শিশুটিকে ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন অভিযোগ ওঠা এক শিক্ষার্থীকে বড় হুজুর মারধরও করেন বলে এজাহারে বলা হয়। পরে

শিশুটি ১২ অগাস্ট তার মাকে ঘটনাগুলো বিস্তারিত জানায়।

এজাহারে বলা হয়, শিশুটির পিতা ১৫ অগাস্ট রাতে মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমের কাছে অভিযোগ করেন। তখন জিয়া ইবনে কাসেম তাকে বলেছিলেন, ৯৯৯ এ ফোন করে অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দেবেন। পুলিশ ও সাংবাদিকদের জানাতে মানা করেন তিনি।

“পরে বাদী জানতে পারেন, জিয়া ইবনে কাসেমও শিশুদের বলাৎকার করে। থানা পুলিশ জানতে পারলে আটক হবেন। এজন্য কৌশলে মাদ্রাসায় যেন পুলিশ আসতে না পারে সেজন্য বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন।”

মামলায় আসামিদের ‘সংঘবদ্ধ চক্র’ হিসেবে তুলে ধরে মাদ্রাসার আরও অনেক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করায় তারা জড়িত বলে অভিযোগে করেছেন বাদী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button