অপরাধ ও দুর্নীতি

আশুলিয়ায় চিরকুটে বিকাশ নম্বর রেখে মিটার চুরি, গ্রেফতার ২

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মিটার চুরি করে আসছিল চক্রটি

তাজা খবর: ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুতের মিটার চুরি করে পরে বিকাশে টাকা দাবি করত একটি সংঘবদ্ধ চোরচক্র। এ চক্রের দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে শিল্প পুলিশ-১।

শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূইয়া।

গ্রেফতার দুজন হলেন- মো. সবুজ মিয়া ওরফে ‘মিটার সবুজ’ (২৫) এবং মো. মারুফ মোল্লা (৩৫)। সবুজ মিয়া সিরাজগঞ্জের চৌহালী থানার পাথরাইল গ্রামের কাইয়ুম আলীর ছেলে। মারুফ মোল্লা একই থানার রেহাই পুকুরিয়া গ্রামের লিটন মোল্লার ছেলে। তাদের কাছ থেকে চোরাই একটি বিদ্যুৎ মিটার, দুটি মুঠোফোন ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ জানায়, গত কয়েক মাস ধরে আইপি-১, ঢাকার আওতাধীন শিল্পাঞ্চলের সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই থানার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মিটার চুরি করে আসছিল চক্রটি। মিটার চুরির পর সেটি ঘটনাস্থলের আশপাশে কৌশলে লুকিয়ে রাখা হতো। এরপর মিটারটি যেখানে ছিল, সেখানে পলিথিনের মধ্যে একটি চিরকুট রেখে দেওয়া হতো। ওই চিরকুটে একটি বিকাশ নম্বর দেওয়া থাকত।

পরে চুরি হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ওই নম্বরে ফোন করলে চক্রের সদস্যরা দর-কষাকষি করত। এরপর বিকাশ নম্বরে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা পাঠানোর পর চুরি করা মিটার ফেরত দেওয়া হতো। এভাবে মিটার চুরি করে টাকা আদায় করত চক্রটি।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে ধামরাই থানার ঢুলিভিটা এলাকায় দি একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের কারখানার ১ নম্বর গেটের সামনে পল্লী বিদ্যুতের স্থাপিত একটি বিদ্যুৎ মিটার চুরি হয়। এ ঘটনায় ধামরাই থানায় ওই দিনই মামলা করা হয়। মামলার নম্বর ১২। এতে দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

মামলার পর আইপি-১, ঢাকার একটি অভিযানিক দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। শিল্পাঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত মিটার চুরির হোতা ও মূল সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়ে মিটার চুরির সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে পুলিশ।

এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল তিনটার দিকে আশুলিয়া থানার পলাশবাড়ী এলাকার ঘোড়াপীর মাজারসংলগ্ন মানিকগঞ্জ বুক হাউসের সামনের সড়কে অভিযান চালায় আইপি-১-এর একটি দল।

পুলিশের ভাষ্য, ওই সময় একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে যাওয়ার সময় সেটিকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। মোটরসাইকেলে থাকা সবুজ মিয়া ও মারুফ মোল্লা পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে পালানোর চেষ্টা করেন। মারুফ মোল্লা দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে অভিযানিক দল তাদের আটকানোর চেষ্টা করে। এ সময় মোটরসাইকেলটি পড়ে গেলে সবুজ মিয়ার বাঁ হাতের কবজিতে ফাটা জখম এবং মারুফ মোল্লার কপালে ছিলে যাওয়ার মতো জখম হয়।

একই ঘটনায় আইপি-১-এর আভিযানিক দলের এসআই (নি.) মো. তারিকুল ইসলামের বাঁ পা ছিলে জখম হয়। কনস্টেবল ৪৩২ মো. নাজমুল হাসান বাঁ কাঁধে আঘাত পান।

আহত সবুজ মিয়া ও মারুফ মোল্লাকে যথাক্রমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাভার এবং ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহত পুলিশ সদস্য দুজনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাভারে চিকিৎসা নেন।

পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ মিয়া দাবি করেন, আইপি-১, ঢাকার শিল্পাঞ্চল থেকে এ পর্যন্ত তিনি ১৫০ থেকে ২০০টি মিটার চুরি করেছেন। আর মারুফ মোল্লা ৬০ থেকে ৭০টি মিটার চুরি করেছেন বলে জানান।

শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের মিটার চুরি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- একমি ল্যাবরেটরিজ, স্টারলিং লন্ডি অ্যান্ড ডেনিমস লিমিটেড, কাইজেন মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ জে ডব্লিউ কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, প্যাক অ্যান্ড টিম প্যাকেজিং লিমিটেড, কাওফিং জিলেটিন লিমিটেড, ম্যাকটেক করপোরেশন লিমিটেড, আয়েশা ক্লোথিং লিমিটেড (পলমল গ্রুপ), হুয়াই ইন্টারন্যাশনাল পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, ইফাদ অটোস লিমিটেড, ট্রেন্ড সেন্ডারস ট্রিমস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ইউবেস্ট (বাংলা) ফ্যাশন কোম্পানি লিমিটেড, টর্ক ডিজাইন লিমিটেড, এম এম মাল্টিমাইন্ড নিট গার্মেন্টস লিমিটেড, সিনলিয়ান ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড এবং ফেব্রিলাইফ ফ্যাশন লিমিটেড।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবুজ মিয়ার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর ও কামারখন্দ থানায় দুটি, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও মির্জাপুর থানায় দুটি এবং আরও কয়েকটি থানায় চুরি, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত মোট ছয়টি মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে মারুফ মোল্লার বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানা, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও মির্জাপুর, সিরাজগঞ্জের চৌহালী, বেলকুচি ও কামারখন্দ এবং মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া ও সিংগাইর থানায় চুরি, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত মোট ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযানে বাংলাদেশ রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন বোর্ডের (বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) হেক্সিং মিটার উদ্ধার করা হয়। মিটারটির নম্বর ১৭৩৯৯৩৯০।

এ ছাড়া একটি ভিভো Y21 D মডেলের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন, একটি টেকনো KM9 মডেলের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন এবং কালো ও লাল রঙের বাজাজ পালসার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেলটির চেসিস নম্বর PSUA11CY4RTF49847, ইঞ্জিন নম্বর DHXPRB08187 এবং নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ল-৬৪৯৪৮৩।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button