অপরাধ ও দুর্নীতি

সাভারে অলিগলিতে থাবা বসিয়েছে মাদক: ভাসমান রিকশায় কেনাবেচা

অনুসন্ধানে নেমে উঠে এসেছে এই নেটওয়ার্কের এক নতুন ও উদ্বেগজনক ছক

তাজা খবর: ঢাকার অদূরে শিল্পাঞ্চল সাভার যেন এখন এক অনিয়ন্ত্রিত মাদক সাম্রাজ্য। স্থানীয় অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়ক মাদকের অপ্রতিরোধ্য বিস্তার ছড়াচ্ছে ক্যানসারের মতো। তবে অনুসন্ধানে নেমে উঠে এসেছে এই নেটওয়ার্কের এক নতুন ও উদ্বেগজনক ছক: ‘চলন্ত মাদক বুথ’। রিকশা চালকদের একটি অংশকে ব্যবহার করে ভাসমান অবস্থায় মাদক বিক্রির কৌশল নিয়েছে কারবারিরা। ক্রেতারা যাত্রী সেজে রিকশায় উঠছেন, পথচলার মাঝেই নিঃশব্দে হাতবদল হচ্ছে ক্ষতিকর মাদকদ্রব্য। এছাড়া আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে শপিংমল কিংবা পাড়া মহল্লা, সড়কের আশেপাশের টং দোকানেও মাদকের বেচাকেনা হচ্ছে।

সম্প্রতি আমিনবাজারে সংঘটিত এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। সেখানে স্থানীয় মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের হামলায় নৃশংসভাবে প্রাণ হারান পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাব হোসেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে মাদকসেবীদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাও যেখানে এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পাননি, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। হত্যাকারীরা অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভারের সমগ্র মাদক নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায়। সাদাপুর গ্রামের মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আবু মোল্লার হাত। স্থানীয়দের ভাষায়, তিনিই এই এলাকার ‘মাদকের গডফাদার’। তার এই সাম্রাজ্যের সহযোগী উজ্জ্বল, কামালসহ আরো কয়েকজন।

​সাদাপুর গ্রামে মাদক প্রবেশের রুট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে একটি পরিকল্পিত ছক। ​রাজাসন মালা মাতবরের মোড় ও গোপেরবাড়ি সংযোগ সড়ক, ​বলিয়ারপুর-গান্দারিয়া রুট ও ​কমলাপুর সীমান্ত সড়ক ব্যবহার করে রাতে আধারে কোটি কোটি টাকার মাদক পৌঁছে যাচ্ছে আবু মোল্লার ডেরায়, যা পরবর্তীতে ভাসমান বিক্রেতা ও ছোটখাটো চক্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সাভারের কোণায় কোণায়।

​আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই সাভারের মাদক সিন্ডিকেট এবং এর পেছনের রিং-লিডারদের একটি বিস্তৃত তালিকা প্রস্তুত করেছে। অন্যদিকে, পুলিশি অভিযানের পরিসংখ্যানেও মিলেছে চরম উদ্বেগজনক তথ্য।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা: দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু সাভার এলাকাকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও এলাকা থেকে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের চিহ্নিত করে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাভারে সহস্রাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্পটে মাদকদ্রব্যের মধ্যে হেরোইন, ফেন্সিডিল, গাঁজা বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে যৌন উত্তেজক ‘ইয়াবা’ ট্যাবলেট সাভারে পাইকারী বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও ফেয়ারডিল, ট্যাপেন্ডাটল ট্যাবলেট, চোলাই মদ অহরহ পাওয়া যাচ্ছে।

আবার ইয়াবা ট্যাবলেটেরও রয়েছে বিভিন্ন কোড নম্বর। কোড নম্বর ভেদে ট্যাবলেটের দাম নির্ধারণ হয়। আবার কিছু কিছু এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা অভিনব কায়দায় শার্টের কলার ও হাতলের ভাঁজে, মানিব্যাগে, জুতার ভেতরে, দিয়াশলাই ও সিগারেটেরে প্যাকেটের ভিতরে রেখে খুচরা এলাকায় ঘুরে ঘুরে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি করছে।

সাভারে শুধু মাদকেই শেষ নয়। এ মাদকের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠেছে অপরাধীর অভয়ারণ্য হিসেবে। চুরি, ছিনতাই, খুন, দেহব্যবসা, ভূমি দখলসহ নানারকম অপরাধের ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। স্থানীয়রা এদের যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হলেও প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা-মামলার শিকার হতে হচ্ছে। প্রশাসনের অনেকের সাথে গোপনে মাদক ব্যবসায়ীদের সখ্যের কারণে ভুক্তভোগীদের আরো ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

এদের সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব স্পটে হানা দেয়ার আগেই তারা পুলিশের উপস্থিতি টেরে পেয়ে যাচ্ছে। জানা যায়, এ সিন্ডিকেটগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে আসছে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি।

​ঢাকা জেলা উত্তর ডিবি পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ​গত ৩ মাসে ২৪৯ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেপ্তার হয়েছেন। দায়ের হয়েছে ১৬৫ টি মামলা। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০জন নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার হচ্ছেন।

​প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ছোটখাটো খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীরা ধরা পড়লেও কেন থামছে না মাদকের বিস্তৃতি?

সাভারের নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহলের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানে কেবল ‘চুনোপুঁটি’দেরই ধরে আনা হচ্ছে। মামলা এবং গ্রেফতারের সংখ্যা বাড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটি ছোট চক্র গ্রেফতার হলে স্থান পূরণ করে নিচ্ছে আরেকটি নতুন গোষ্ঠী।

ঢাকা জেলা ডিবি (উত্তর) এর অফিসার ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম বলেন, গত ৩ মাসে ২৪৯ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দায়ের করা হয়েছে ১৬৫ টি মামলা। উদ্ধার করা হয়েছে এক কোটি ৫৭ লাখ টাকার মাদক। মাদক উদ্ধার এবং মাদক ব্যবসায়ীদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাভার বেদে পল্লী এলাকা থেকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী অমিত ও তার চার সহযোগীকে ১০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেপ্তার করছে ঢাকা উত্তর ডিবি পুলিশ। এলাকাবাসীর অভিযোগ সাভারে বেদেপল্লীতে রয়েছে এই অমিতের বিশাল মাদকের সিন্ডিকেট । তার ভয়ে অনেকেই কথা বলতে সাহস পায় না। অমিতের অন্য সহযোগিদের গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নিকট দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা।

গত ১৬ জুন (মঙ্গলবার) দিবাগত রাত ১১ টার দিকে সাভারের চাপাইন এলাকায় অভিযান চালিয়ে

সাভার সদর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক তাইসির খানকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পাশাপাশি ওই ছাত্রদল নেতার ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার পর তাইসির খানকে তার পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তখন বলেছিলেন, ইয়াবাসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছি। তার মাদক সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে একজন সক্রিয় ছাত্র নেতার এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন। পরদিন তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর সাভারের রাজাশনের শীর্ষ মাদক সম্রাট শামীম রেজা, তার ম্যানেজার ফেরদৌস আহমেদ রাজু এবং সহযোগী রাকিব হোসেনকে গত ১০ জুন কক্সবাজার সদর থানা এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে।

​সুশীল সমাজের দাবি, সাভারকে মাদকমুক্ত করতে হলে গোয়েন্দা তালিকার শীর্ষে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে তাদের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে। মাদকের জোগান বন্ধ না করে কেবল খুচরা বিক্রেতা বা সেবীদের গ্রেপ্তার করে এই ব্যাধি নির্মূল করা অসম্ভব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button