অপরাধ ও দুর্নীতি

সাভারে এসবির এসআইকে পিটিয়ে হত্যা, আরও ১০ জন গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় সবাই মাদক কারবারসহ নানা অপকর্মে জড়িত

তাজা খবর: ঢাকার সাভার থানার আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজনকে পাঁচ দিনের পুলিশি রিমান্ডে দিয়েছেন আদালত।

গতকাল রোববার রাতে সাভার, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ওই দিন সকালে মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে যে ব্যক্তিগত গাড়িকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত, গতকাল রাতে সাভার পৌর এলাকার উত্তরপাড়া থেকে সেই গাড়িও জব্দ করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গাড়িটির মালিক মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলাম। ঘটনার সময় তিনিই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় সবাই মাদক কারবারসহ নানা অপকর্মে জড়িত। তাঁদের ২০ থেকে ৩০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল রয়েছে। দলের সদস্যরা এলাকায় বখাটেপনা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্ম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে।

গতকাল রাতে গ্রেপ্তার ১০ জনের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয়জন হলেন আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০), ইমরান (২৬), নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪) ও রাকিব মিয়া (২৮)।

এজাহারের বাইরে গ্রেপ্তার চারজন হলেন সাব্বির আহমেদ (২৪), ওয়াসিম (৪০), বিল্লাল হোসেন (৩০) ও দেলোয়ার হোসেন (২৮)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জহিরুল ইসলামকে আজ সোমবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অন্য দিকে বিল্লাল হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনকে পৃথকভাবে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। তবে আদালত রিমান্ডের শুনানি না করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গ্রেপ্তার অপর আটজনকে থানায় রাখা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) তাঁদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মদিনা হাউজিংয়ে সংঘবদ্ধ দলের আড্ডা
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে আমিনবাজারের সালেহপুর সেতু থেকে কয়েক শ গজ দূরে মদিনা হাউজিং। স্থানীয় লোকজনের কাছে এলাকাটি ‘বালুর মাঠ’ নামেও পরিচিত। অনেকটা নির্জন এই এলাকায় ফাঁকা ফাঁকা বাড়িঘর রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসআই আলতাব হোসেন হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই মদিনা হাউজিং এলাকায় নিয়মিত আড্ডা দেন। সেখান থেকেই তাঁরা বিভিন্ন অপকর্ম পরিচালনা করেন। ঘটনার দিন শনিবার রাতেও আসামিদের অধিকাংশই ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। জহিরুল ইসলামের সঙ্গে থাকা মজিবুর রহমানের ফোন পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এলাকাটিতে ২০ থেকে ৩০ জনের একটি দল রয়েছে। স্থানীয় আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য শামসুল হকের দুই ছেলে আপন ও জিহাদ দলটির নেতৃত্ব দেন। মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামের সঙ্গে দুই ভাইয়ের (আপন ও জিহাদ) ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এ দলের সদস্যরা এলাকায় মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, বখাটেপনাসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত।

পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আলতাব হোসেন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অনেকেই মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। আপন ও জিহাদের মা জাহি বেগম মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। তিনি একাধিকবার মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন বলেও তাঁরা জানান। এ ছাড়া আপন ও জিহাদও মাদক বেচাকেনা করেন বলে অনেকে জানিয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেও সাভার থানায় একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামের মা রুকি বেগমও এলাকার পরিচিত মাদক কারবারি। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৮টি মাদকের মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর জহিরুল ইসলাম পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁর মা মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনি তাঁর সঙ্গে থাকেন না। পাশের এলাকায় বসবাস করে তিনি রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা করেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জহিরুল ইসলাম নিজেও মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, গত শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে জহিরুল ইসলাম তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে বরদেশী এলাকার মদিনা হাউজিংয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন মজিবর, কাশেম, আলমগীর ও মাসুদ।

হাউজিংয়ের ভেতরে একটি অটোগ্যারেজের সামনে পৌঁছালে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে তাঁদের গাড়ি আটকে যায়। গ্যারেজের সামনে রাস্তার দুই পাশে অটোরিকশা দুটি দাঁড় করিয়ে রাখায় গাড়ি চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। এ নিয়ে প্রথমে গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে জহিরুল ইসলামের তর্কবিতর্ক হয়। একপর্যায়ে জহিরুল ইসলাম আবুল কালাম আজাদকে চড়-থাপ্পড় মারেন।

এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন এসবির উপপরিদর্শক আলতাব হোসেন। তিনি তখন পাশের মসজিদে নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। প্রতিবাদ করায় জহিরুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা আলতাব হোসেনকেও মারধর করেন।

মারধরের শিকার হয়ে প্রাণভয়ে আলতাব হোসেন পাশেই থাকা তাঁদের নিজেদের একটি কারখানায় গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে আসামিরা সংঘবদ্ধ হয়ে ওই কারখানায় গিয়ে হামলা চালান। সেখানে আলতাব হোসেন ও তাঁর ছেলেকেও এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় আলতাব হোসেনকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। শুধু আসামিরাই নন, তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

ওসি আরও বলেন, প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামের মা রুকি বেগম ও গ্রেপ্তার বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে কয়েকটি করে মাদকের মামলা রয়েছে।

সাইফুল আলম বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে প্রথমে মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রাতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি রয়েছেন ছয়জন।

ওসি বলেন, গ্রেপ্তার ১০ জনের মধ্যে জহিরুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে জহিরুল ইসলামের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। অপর দুজনের রিমান্ডের শুনানি না করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button