সাভারে কোটি কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম
কাজ শুরুর আগেই বেআইনিভাবে কোটি টাকার সরকারি কাজ বিক্রি
তাজা খবর: ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ ভেস্তে যেতে বসেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তদারকি কর্মকর্তাদের একটি অসাধু সিন্ডিকেটের হাত ধরে। সিডিউল ও নকশাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কোথাও ব্যবহার করা হচ্ছে ২ ও ৩ নম্বর মানহীন ইট, কোথাও ঢালাই থেকে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে রড, আবার কোথাও কাজ শুরুর আগেই বেআইনিভাবে কোটি টাকার সরকারি কাজ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধান, স্থানীয়দের অভিযোগ এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে উন্নয়ন কাজের নামে এই নয়ছয় ও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
নোয়াড্ডা-মাদারটেক-ঘোরাডিয়া সড়ক:
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫২ টাকা ব্যয়ে ১৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ‘নোয়াড্ডা রোড হয়ে মাদারটেক-ঘোরাডিয়া’ সড়কটি ইউনিব্লক দ্বারা উন্নয়নের কাজ পায় এম আর ট্রেডিং নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে সড়কটিতে গিয়ে দেখা যায়, কাজের সিডিউল অনুযায়ী যেখানে উন্নতমানের ১ নম্বর ইট ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, সেখানে পুরো সড়ক জুড়ে অত্যন্ত নিম্নমানের লালচে-হলুদ ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ইট। কাজের মান দেখতে গিয়ে দেখা যায়, রোলার দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই ইটগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে বালুর সাথে মিশে যাচ্ছে। সড়কের আগের পুরাতন ইট প্রতি পিস ১৫ টাকা ধরে ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে এক নাম্বার ইট পাওয়া যাচ্ছে আরো অনেক কমে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা অভিযোগ করে বলেন, “চোখের সামনে এভাবে দুই নম্বর ইট দিয়ে রাস্তা করা হচ্ছে। গাড়ি চললে তিন মাসও এই রাস্তা টিকবে না।”
ফারুক হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে সড়কটির উন্নয়ন করা হচ্ছে, সামান্য বৃষ্টি হলেই আবার ভেঙ্গে যাবে। সড়কের পাশ দিয়ে কোথাও কোথাও ২০ ফুট ২৫ ফুট গভীর খাদ রয়েছে।
সড়কটির কাজ দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল ইসলাম বলেন, কাজে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। ওই সড়কের পুরাতন ইট দিয়েই সড়কটি সংস্কার হচ্ছে। হয়তো ঠিকাদারের কিছু ইট কিনতে হবে। পুরাতন প্রত্যেকটা ইট ১৫ টাকা করে দাম ধরা হয়েছে। রোলার দিয়ে ডলার দেওয়ায় ইট ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই একটা খারাপ ইট থাকতে পারে।
কাজের অনিয়মের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে দেয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মোঃ সাকিবের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, এই সড়কটির কাজের অনিয়মের খবর আমি আগেই পেয়েছি। সড়কের আগের পুরাতন ইট দিয়েই কাজ চলছিল। কিন্তু আগের ইটগুলো ছিল তিন নাম্বার। যার কারনে রোলার দিয়ে ডলা দিলেই ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সড়কের সাইটেও অনেক গভীরতা ১৫ থেকে ২০ ফিটের কম হবে না। বৃষ্টি হলেই সড়কটি ভেঙ্গে পড়ারও আশংকা রয়েছে। তিনি বলেন, সড়কটির কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কুরগাঁও-গকুলনগর সড়ক:
একই প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার ৪২৫ টাকা ব্যয়ে ১৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ দশমিক ৭ মিটার প্রস্থের ‘কুরগাঁও-গকুলনগর’ সড়কটি ইউনিব্লক দ্বারা উন্নয়নের দায়িত্ব পায় ডন এন্টারপ্রাইজ।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে, সড়কটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং দুই পাশ যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য সিডিউল ও অফিশিয়াল ড্রয়িং-ডিজাইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পুরুত্বের ঢালাই (সাইড প্রটেকশন) দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ড্রয়িংয়ের ধার ধারেনি। সিডিউল তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতি নিম্নমানের সিমেন্ট, বালু ও সুরকি দিয়ে নামকাওয়াস্তে প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করছিল।
সড়কের মারাত্মক নিম্নমানের কাজ দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। একপর্যায়ে স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে কাজের অনিয়ম ধরে ফেলেন এবং সরাসরি নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। অনিয়মের সত্যতা পেয়ে পরবর্তীতে উপজেলা প্রকৌশল (এলজিইডি) অফিস থেকে ডন এন্টারপ্রাইজকে লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে এ পর্যন্ত করা নিম্নমানের সম্পূর্ণ অংশ ভেঙে ফেলে নতুন করে সিডিউল অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের পর থেকে বর্তমানে সড়কটির উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
পাথালিয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শাওন বলেন, সিডিউল তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো অতি নিম্নমানের সিমেন্ট, বালু, রড কম দিয়ে সড়কের প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করছিল। পাথর যে গ্রেডের দেওয়ার কথা ছিল সেটিও দেয়নি। আমরা বিষয়টি উপজেলা প্রকৌশলিকে অবহিত করলে তারা এসে কাজ বন্ধ করে দেন এবং নিম্নমানের যে কাজ করেছিল সেটা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
কাজটির তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। এমনকি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরপর দুটি চিঠিও দিয়েছি যে কাজ নতুন করে করতে হবে। গত এক সপ্তাহ ধরে কাজটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ড্রয়িং- ডিজাইন অনুযায়ী কাজ করেনি, ম্যাটেরিয়ালস কম দিয়েছে তাই কাজ বন্ধ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, তদারকির দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ার এর গাফেলতির কারণেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজে অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ডন এন্টারপ্রাইজের সুপারভাইজার মোঃ মিজান বলেন, আমরা সঠিকভাবে কাজ করছিলাম। পাথর দুই একটা বড় বড় ছিল। রডের রিং দুই -একটি জায়গায় কম হয়েছিল এই অভিযোগ তুলে আমাদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে এবং ভেঙ্গে ফেলেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় কয়েকজন আমাদের কাছে মালামাল বিক্রি করতে চেয়েছিল আমরা তাদের কাছ থেকে নেইনি। এ কারণেই আমাদের উপর তারা ক্ষুব্ধ। আমাদের লস যা হওয়ার তা তো হয়েছেই। এখন আমাদের কাজের সুযোগ করে দিলে আমরা পুনরায় কাজ করবো তাহলে বন্ধই থাকবে বলেন তিনি।
কুটুরিয়া ৪০ ফিট আরসিসি সড়ক:
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে উপজেলা ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (ইউডিএফ) আওতায় নির্মিত ‘কুটুরিয়া ৪০ ফিট’ সড়কে। প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রস্থের এই আরসিসি সড়কটির কাজ পায় গোল্ডেন কনস্ট্রাকশন।
পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী সরকারি কাজের উপ-চুক্তি বা সাব-লিজ সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও, গোল্ডেন কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু করার আগেই গোপনে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে এটি মিথিলা ট্রেডার্স নামে আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়।
নতুন ঠিকাদার মূল খরচের টাকা তুলতে গিয়ে সড়কের বুনিয়াদি শক্তিতেই হাত দিয়েছে। সরেজমিনে স্থানীয়রা দেখান, সড়কের সাব-বেসে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হয়েছে পচা ৩ নম্বর ইট। এছাড়া আরসিসি ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ড্রয়িং অনুযায়ী যতটুকু রড দেওয়ার কথা, দেওয়া হচ্ছে তার কম।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী এস এম সাব্বির হোসেনের মুখোমুখি হয় এই প্রতিবেদক।
সড়কটির কাজের বরাদ্দ, সরকারি সিডিউল ও ড্রয়িং সংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। বারবার তথ্যের জন্য চাপ দেওয়া হলে তিনি এক পর্যায়ে অবিশ্বাস্য দাবি করে বলেন, “কাজের ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরকারি প্রকল্পের ফাইল ‘খুঁজে পাচ্ছেন না’ বলায় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তা ও অনিয়মকারী ঠিকাদারদের মধ্যকার নীরব যোগসাজশের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
স্থানীয় দোকানী শামীম হোসেন বলেন, গার্মেন্টস শিল্পবেষ্টিত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের সড়কগুলোর এমন বেহাল দশায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও কারখানা শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন পরে সড়কটির উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে কাজ চলছে। রডগুলো দেয়া হয়েছে চিকন। রডের গ্যাপ কোথাও ১০ ইঞ্চি কোথাও এক ফুটেরও বেশি।
স্থানীয় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঠিকাদাররা চুরি না করলে লাভ করবে কিভাবে।
এসব বিষয়ে জানতে মিথিলা ট্রেডার্স নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের ভাই কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ফরহাদ হোসেন বলেন, খোলা থেকে ইট আনার সময় তিন নাম্বার ইট দুই-চারটা আসতেই পারে। আমাকে তো আর ইঞ্জিনিয়ার অফিস থেকে বলে দেয় নাই তিন নাম্বার ইট সরিয়ে রেখে কাজ করার জন্য। রডের গ্যাপ বেশি থাকার বিষয়ে বলেন, গ্যাপ আট ইঞ্চি করে রেখে সব ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি ইঞ্জিনিয়ারকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি লোক পাঠিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। প্রকৌশল অফিস থেকে ফাইল গায়েবের বিষয়ে বলেন, কাজের ফাইল না পাওয়ার কিছু নাই, তাছাড়া সব কম্পিউটারেই আছে।
এসব বিষয়ে কথা বলতে এলজিইডির সাভার উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ মিনারুল ইসলামের দপ্তরে দুইদিন ঘুরেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠো ফোনে ফোন করে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরে সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে ফোনটি রেখে দেন।



