সাভারে এসআই হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা অধিকাংশ মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য
এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক হত্যাকাণ্ডের পুরোনো ইতিহাসও
তাজা খবর: ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রাম এখন আবার আলোচনায়। আতঙ্কের জনপদ এই নগরী একদিকে ঘনবসতি, পাশাপাশি অন্যদিকে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চলদিয়ে ঘেরা এই বসতি। সন্ধ্যা নামলেই অনেকটা বদলে যায় এলাকার চিত্র। ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা, মাদক কেনাবেচা, কিশোরদের সংঘবদ্ধ চলাফেরা আর বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে দীর্ঘ কয়েকবছর ধরেই আলোচনায় বড়দেশী।
সর্বশেষ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপ-পরিদর্শক আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সেই আলোচনাই আবার সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় গ্রেফতার কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের বেশিরভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকা থেকে গাঁজা ও হেরোইনসহ বহু লোককে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছিল পুলিশ।
আমিনবাজারে পুলিশের এসবি অফিসারকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাসিন্দা বলেন, এখানে বেশিরভাগ মানুষই মাদকের সংঙ্গে জড়িত। কেউ খায়, না হয় কেউ বিক্রি করে। পুলিশ প্রশাসন আগে থেকেই মাসোয়ারা নিয়ে নীরব থাকে। গত শনিবার এলাকার শত শত মানুষ মানববন্ধনে এ সব আওয়াজ তুলেন।
বড়দেশীর অপরাধচিত্র শুধু মাদককেন্দ্রিক নয়। এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাধিক হত্যাকাণ্ডের পুরোনো ইতিহাসও।
জানা গেছে, ২০০৭ সালের ৩ মার্চ আমিনবাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব-১১ এর উপ-সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া নিহত হন। এরা মাদকের অনুসন্ধানে গাংচিল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। পরে তাদের মুখের ভিতর গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কিছুদিন পর একই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে পুলিশের উপপরিদর্শক মতিউর রহমান নিহত হন। তিনি মাদকের আসামি ধরতে গিয়ে মাদকব্যসায়ীদের হাতেই গুলিতে নিহত হন।
এরপর আসে ২০১১ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনা। ১৭ জুলাই বড়দেশীর কেবলারচরে বেড়াতে যাওয়া ছয় ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং বড়দেশীর নাম জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ওই মামলায় ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অর্থাৎ এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারও শেষ পর্যন্ত বড় একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে। কিন্তু এরপরও বড়দেশীর অপরাধের ইতিহাস থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে বাবা-ছেলে হত্যাকাণ্ড, ২০২৬ সালে দেলোয়ার হোসেন হত্যা, শারমিন আক্তার লিজা হত্যা এবং সর্বশেষ এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছর গুলোতেও একের পর এক হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, বড়দেশী এলাকায় মাদক কেনাবেচা অনেকটাই প্রকাশ্য। বিশেষ করে নির্জন জায়গা, বালুর মাঠ ও বসতিপ্রবণ এলাকার বাইরে কিছু স্পটে মাদকসেবীদের আড্ডা চলে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। সরকার দলীয় কয়েকজন নেতার প্রশ্রয়ে চলে এসব মাদক স্পট।
সম্প্রতি এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর বড়দেশীতে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে।
র্যাবের দেওয়া তথ্যনুযায়ী আলতাব হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতারদের মধ্যে আপন ও জিহাদ অপরাধপ্রবণ এবং তারা ওই অঞ্চলের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। র্যাব আপনকে একটি গ্যাংয়ের দলনেতা ও মাদক সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মামলার তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
র্যাব-১০ এর অধিনায়ক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশ মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আটকরা সরাসরি হত্যার মিশনে অংশ নেন।
বড়দেশীর ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
এলাকার কিছু অংশ তুলনামূলক নির্জন। ফাঁকা জায়গা, বালুর মাঠ ও চরাঞ্চলের কারণে সন্ধ্যার পর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এমন পরিবেশ মাদকসেবী, মাদক কারবারি কিংবা অন্যান্য অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে এসেছে, দিনের বিভিন্ন সময়ও কিছু ফাঁকা জায়গায় মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়।
তবে পুলিশের টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, মাদকবিরোধী অভিযান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার সবকিছুতেই সচ্ছতার প্রয়োজন। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কথা বললে হামলা বা হয়রানির আশঙ্কা থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিনি ও তার ছেলে আগে মারধরের শিকার হয়েছিলেন। তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ধরনের অভিযোগে এলাকায় অপরাধীদের সামাজিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ড বড়দেশীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
পুলিশ হত্যার সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশ মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গাড়ি পার্কিং ও অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে বিরোধের মধ্যে আলতাব হোসেন সেখানে মধ্যস্থতা করতে যান। এরপর তিনি হামলার শিকার হন। তাকে ও তার ছেলেকে তাদেরই একটি পোশাক কারখানার ভেতরেও মারধর করা হয় বলে পুলিশ ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। গুরুতর আহত আলতাব সেখানেই নিহত হন। হামলার সময় তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও হামলা থামেনি বলে র্যাবের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় এরই মধ্যে ১৫ জন এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। পুলিশের দাবি, গ্রেফতারদের কয়েকজন কিশোর গ্যাং ও মাদক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
বড়দেশীর অপরাধচিত্র বুঝতে হলে শুধু সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড নয়, গত দুই দশকের পুলিশি নথি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোন বছরে কতটি হত্যা মামলা হয়েছে? কতজন নিহত হয়েছেন? কত মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়েছে? কতটির চার্জশিট হয়েছে? কত মামলার বিচার শেষ হয়েছে? কতজন সাজা পেয়েছেন? আর কতজন খালাস পেয়েছেন?
এর পাশাপাশি মাদক মামলার সংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। শত শত মাদক ব্যাবসায়ী মাদক মামলায় আটক হলেও মাদকের ব্যবসা জমজমাট রয়েছে আমিননাজারের মাদক সমস্যা অপরাধের বড় কারণে। দীর্ঘদিনের পরমপরায় অভ্যস্থ মাদক ব্যবসা, নির্জন পরিবেশ, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, স্থানীয় বিরোধ এবং দুর্বল নজরদারির সমন্বিত অভাবেই কারনেই আমিমবাজার আতঙ্কের নগরীতে পরিনত হচ্ছে।
এসআই আলতাব হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। এই এলাকার বড়দেশীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক হত্যাকাণ্ড, মাদক উদ্ধারের ঘটনা এবং কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অপরাধ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এলাকাটির সামগ্রিক অপরাধপ্রবণতা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
ঢাকার মিরপুরে পাশ্ববর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে সাধারণ মানুষের বসবাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। অপরাধ দমনে প্রয়োজন নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান, দৃশ্যমান পুলিশি টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর কারণ চিহ্নিত করা এবং মামলা দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবী এলাকাবাসীর।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম বলেন, আমিনবাজার বড়দেশী গ্রামটিতে চলাচলের ব্যবস্থা নাজুক, তবুও গ্রামটিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখার পরিকল্পনা চলছে পুলিশের। সেখানে আমিন বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের ধরতে পুলিশ বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।



