অপরাধ ও দুর্নীতি

সাভারের আশুলিয়ায় দালালদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল

জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে দালালরা এই সুযোগ নিচ্ছে

তাজা খবর: খোলা আকাশের নিচে সরকারি হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে বুকের এক্স-রে ফিল্ম দেখছেন এক ব্যক্তি। দিচ্ছেন চিকিৎসাসংক্রান্ত নানা জটিল পরামর্শও। আপাতদৃষ্টিতে তাকে অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসক মনে হলেও, তিনি মূলত পাশের এক অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিহ্নিত দালাল। মূলত ঢাকা জেলার সাভারের আশুলিয়ায় বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের তীব্র জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে দালালরা এই সুযোগ নিচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ও কোরিয়ার যৌথ উদ্যোগে (জিটুজি প্রজেক্ট) ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে দুই যুগ পর এসে সেই উদ্দেশ্য আজ ভেস্তে গেছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও চরম জনবল সংকটের কারণে ৫০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানটি এখন পুরোপুরি দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান না থাকায় চিকিৎসা সরঞ্জামের সব কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে নামমাত্র সচল থেকে একপ্রকার বেকার সময় পার করছে পুরো হাসপাতাল। এমনকি বকেয়া পাওনা না মেটানোয় গত দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সরকারি ওষুধের সরবরাহও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৈত্রী হাসপাতালের মূল ফটক ও আশপাশের ১০০ গজের মধ্যেই গড়ে উঠেছে নামে-বেনামে একাধিক অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন সকাল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র জরুরি বিভাগ ও মূল ফটকে সক্রিয় থাকে। রোগী টিকিট কেটে বের হওয়া মাত্রই কম খরচে ও দ্রুত চিকিৎসার নানা প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক নিকটস্থ ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। নিউ সেবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আয়েশা হাসপাতাল, নাসির উদ্দিন ক্লিনিক, জাহানারা ক্লিনিক ও গাজী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিহ্নিত দালালরা সরাসরি হাসপাতাল চত্বরে প্রবেশ করে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে। এসবের মধ্যে আঞ্জুয়ারা, মনির, রুহুল, ফেরদৌস, শাহাজানসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যারা পার্শ্ববর্তী ক্লিনিকগুলোর মার্কেটিং বিভাগে বা দালাল হিসেবে কর্মরত।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভুক্তভোগী রোগী রিয়াদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এক্স-রে, ইসিজি ও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাসহ ছোটখাটো অপারেশনের সরঞ্জাম থাকলেও লোকবলের অভাবে সেবা বন্ধ। বাধ্য হয়েই দালালদের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত টাকায় বাইরের ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

হাসপাতালে একমাত্র ভর্তি শরীফুল বলেন, এখানে আসার পর আমাকে দালালের সাথে সামনের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন চেকআপ ও পরীক্ষার জন্য। সেই রিপোর্ট দেখানোর পর বলা হয়েছে ভর্তি থাকতে হবে। ভর্তি হয়েছি ঠিক কিন্তু ওষুধ, স্যালাইন সব বাহির থেকে কিনতে হয়েছে। এখানে উল্টো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এখানে দালালরাই সব কিছু।

দালাল চক্রের সদস্য আঞ্জুয়ারার সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি তার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেন, এসব বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

এদিকে অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতালের ট্রেজারার নার্গিস আক্তারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার নিজেরই রয়েছে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আয়েশা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করেন তার স্বামী ও শিমুলিয়া ইউনিয়নের ইয়ার হোসেন। এছাড়া হাসপাতালে প্রজেক্ট চলাকালীন নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্রিল্যান্সার কর্মীদের বিরুদ্ধেও রোগীদের নির্দিষ্ট ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি ট্রেজারার নার্গিস আক্তার। তবে পরবর্তীতে ধারণ করা গোপন কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, হাসপাতালটি তার স্বামীর, তার নয়। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। অন্যদিকে, তার টেবিলেই বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিহ্নিত দালাল আঞ্জুয়ারার হাতের লেখা ফোন নম্বর পাওয়া গেলেও সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে তাকে চেনেন বলে দাবি করেন তিনি।

অব্যবস্থাপনা ও দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ডা. এস কে এম শিবলী রহমান জানান, মন্ত্রণালয়ে একটা মিটিং সম্পন্ন হয়েছে। তারা বাজেটগুলো এখনো হাতে পাননি, মূলত তিনটি প্রধান ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। প্রথমত বাজেট প্রাপ্তি, দ্বিতীয়ত আউটসোর্সিংয়ে কর্মী নিয়োগ ও তৃতীয়ত প্রজেক্ট থেকে পাওয়া চিকিৎসা সরঞ্জামাদি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাজেট খুব দ্রুত ছাড় হয়ে যাবে। ওষুধের বকেয়ার বিষয়ে তিনি জানান, সেটি প্রজেক্ট চলাকালের বিষয় ছিল, তাই সরাসরি কিছু বলতে পারবেন না।

হাসপাতালে দালালচক্রের বিস্তার নিয়ে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত সিকিউরিটি ছাড়া দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটি সবেমাত্র সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এলো, তাই পর্যায়ক্রমে সব হবে। কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ হলে পরিস্থিতি বদলাবে। নতুন বাজেটে ১০-১৫ জন আনসার সদস্য নিয়োগের বাজেট চাওয়া হবে। তা পেলে নিরাপত্তার একটি বড় ভিত্তি তৈরি হবে।

তিনি আরও জানান, এই মুহূর্তে হাসপাতালে মোট ৫ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। স্থায়ী অনুমোদিত স্টাফ আছেন মাত্র একজন এবং সংযুক্তিতে আছেন পাঁচজন। আর আউটসোর্সিং নিয়োগ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button