সারা বাংলা

সাভারে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট সমাধান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি গণমানুষের

দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট জনজীবনকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে

তাজা খবর: ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট জনজীবনকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, পোশাকশ্রমিক, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, একদিকে আয় বাড়ছে না, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা দ্রুত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সাভার পৌর এলাকার বাসিন্দা ও গার্মেন্টস শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, সারাদিন কারখানায় কাজ করার পর বাসায় ফিরে দেখি বিদ্যুৎ নেই। প্রচণ্ড গরমে ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হয়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। আবার গ্যাস না থাকায় রান্নাও সময়মতো করা যায় না। এত কষ্টের মধ্যেও বাজারের সব জিনিসের দাম বেড়েই চলছে।

ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। লোডশেডিংয়ের কারণে বাসার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও নষ্ট হচ্ছে। সরকার যেন দ্রুত এই সংকটের স্থায়ী সমাধান করে।

সাভারের আমিনবাজার এলাকার বাসিন্দা সেলিনা আক্তার বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে সকালে রান্না করতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনতে হয়। এতে সংসারের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

রিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, দিনে যা আয় করি, তার বেশিরভাগই বাজার করতে শেষ হয়ে যায়। চাল, ডাল, তেল, সবজি—সব কিছুর দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যায় বাসায় গিয়েও শান্তি নেই। সাধারণ মানুষের কষ্ট কেউ যেন দেখছে না।

সাভার বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে দোকানের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্রিজে রাখা অনেক পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার পাইকারি বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রিও কমে গেছে। ক্রেতারা আগের মতো কিনতে পারছেন না।

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার পোশাকশ্রমিক শিউলি আক্তার বলেন, মাস শেষে বেতন হাতে পাওয়ার আগেই ধার-দেনা করতে হয়। গ্যাসের সংকটের কারণে রান্না করতে পারি না, বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুমানো যায় না। এর ওপর বাজারের দাম আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

স্থানীয় একটি হোটেলের মালিক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক সময় সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বাধ্য হয়ে খাবারের দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতারাও অসন্তুষ্ট।

গৃহিণী রোজিনা আক্তার বলেন, আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার করা যেত। এখন সেই টাকা তিন-চার দিনও চলে না। সবজির দাম, মাছ, মাংস, ডিম-সবকিছুই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শিল্পাঞ্চল হওয়ায় সাভারে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই লোডশেডিং ও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা এবং ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।

শ্রমজীবী মানুষের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তারা বলেন, বাজারে অনেক সময় একই পণ্যের দাম একেক দোকানে একেক রকম নেওয়া হয়। নিয়মিত মনিটরিং থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ পাবে না।

সাভারের বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা যায়, অনেক পরিবার এখন খরচ কমানোর জন্য মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ সন্তানদের পুষ্টিকর খাবারও আগের মতো দিতে পারছেন না। চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বাসাভাড়ার ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মজুতদারি রোধ এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

শ্রমজীবী মানুষের একটাই প্রত্যাশা নিয়মিত বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস এবং সহনীয় দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। তাদের ভাষায়, আমরা বিলাসিতা চাই না, শুধু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ চাই।

সাভারের সাধারণ মানুষ আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হলে শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে এবং শিল্পাঞ্চল সাভারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button