আশুলিয়ায় অটোভ্যান চালককে গলা কেটে হত্যা, ২৪ ঘন্টার মধ্যে মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ২
মারুফ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আর তানভীর নিহতের লুণ্ঠিত অটোভ্যানটি তাঁর কাছ থেকে কিনেছিলেন
তাজা খবর: আশুলিয়ায় নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে অটোভ্যানচালক মো. সুজন হাওলাদারকে (২৯) গলা কেটে হত্যার ঘটনায় মূলহোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে নেমে মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন- মাদারীপুরের কালকিনি থানার শসতল গ্রামের মো. হারুন ঢালির ছেলে মো. মারুফ (৩৯)। বর্তমানে তিনি ঢাকার লালবাগ থানার বাগানবাড়ী সৈয়দনগর এলাকায় নাহিদ ইসলামের গ্যারেজে বসবাস করে আসছিলেন। অপরজন একই থানার শসতল গ্রামের মো. আজিজুল ঢালির ছেলে তানভীর ঢালি ওরফে আকাশ (২২)।
পিবিআইয়ের দাবি, মারুফ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আর তানভীর নিহতের লুণ্ঠিত অটোভ্যানটি তাঁর কাছ থেকে কিনেছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে নিহত সুজনের অটোভ্যান ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। পরে মারুফের দেখানো মতে ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতিও উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, নিহত সুজন হাওলাদার পটুয়াখালী সদর থানার লোহালিয়া ইউনিয়নের কুড়িপাইকা গ্রামের মো. আমির হাওলাদারের ছেলে। তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন আগানগর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত ৮ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে নিজের অটোভ্যান নিয়ে বাসা থেকে বের হন সুজন। রাত ৯টার দিকে স্ত্রীকে ফোন করে কথা বলেন। এরপরই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাননি। এর দুই দিন পর, ১০ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়া থেকে আব্দুল্লাহপুরগামী সড়কের পাশে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ৮১/১ ও ৮১/২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থান থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহের মাথায় থেতলানো আঘাত এবং গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। খবর পেয়ে নিহতের মা ও স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় নিহতের মা মোসা. আলো বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। ১১ আগস্ট পিবিআই ঢাকা জেলা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং পুলিশ পরিদর্শক মো. জামাল উদ্দীন বিপিএম-কে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, মামলাটি তদন্তে নেওয়ার পর ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করার পর তাঁর নিখোঁজ হওয়ার সময়, সর্বশেষ মোবাইল যোগাযোগ, পূর্বপরিচিত ব্যক্তি এবং অটোভ্যানটির গতিবিধি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণে তদন্তের সূত্র গিয়ে পৌঁছায় মারুফের কাছে। পরে অটোভ্যানটির গতিবিধি অনুসরণ করে পিবিআইয়ের একটি দল মাদারীপুরে অভিযান চালায়। ১১ আগস্ট সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে মাদারীপুর সদর থানা এলাকার আনসার ক্যাম্পের সামনে একটি অটো গ্যারেজ থেকে মারুফ ও তানভীর ঢালি ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় নিহত সুজনের লুণ্ঠিত অটোভ্যান। মারুফের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় সুজনের মোবাইল ফোন।
পিবিআই জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মারুফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত এবং গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, মারুফ নিজেও একজন ভ্যানচালক এবং নিহত সুজনের পূর্বপরিচিত ছিলেন। গত ৮ আগস্ট রাত ৯টার দিকে সুজন তাঁর অটোভ্যান নিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় মারুফের সঙ্গে দেখা করেন। সেখান থেকে দুজন বেড়িবাঁধ হয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরের উদ্দেশে রওনা দেন।
পরদিন ৯ আগস্ট ভোররাত ৩টার দিকে কাশিমপুরে অটোভ্যানে মালামাল লোড করার পর তাঁরা ঢাকার লালবাগের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে আশুলিয়া ব্রিজ এলাকায় এসে অটোভ্যানটি বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গাড়িটি ঠিক করতে না পারায় তাঁরা নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে অবস্থান নেন।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দুজন ইয়াবা সেবন করেন। একপর্যায়ে সুজন নেশাগ্রস্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তখন মারুফ তাঁর অটোভ্যান থেকে একটি চাপাতি নিয়ে আসেন। পরে ৯ আগস্ট দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে ঘুমন্ত সুজনের মাথায় একটি ভারী পাথর দিয়ে সজোরে আঘাত করেন মারুফ। এরপর চাপাতি দিয়ে তাঁর গলায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর চাপাতিটি পানিতে ফেলে দেন মারুফ। ঘটনাস্থলে সুজনের মরদেহ রেখে তাঁর অটোভ্যান ও মোবাইল ফোন নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। হত্যার পর সুজনের অটোভ্যান নিয়ে মারুফ লালবাগে চলে যান। পরদিন ১০ আগস্ট সকালে অটোভ্যানটি চালিয়ে মাদারীপুরের উদ্দেশে রওনা হন।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদারীপুরে পৌঁছে তানভীর ঢালি ওরফে আকাশের কাছে অটোভ্যানটি ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন মারুফ। অটোভ্যানটির অবস্থান শনাক্ত করার পরই তদন্তকারীরা মাদারীপুরে অভিযান চালান। সেখান থেকে অটোভ্যানসহ মারুফ ও তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।



