সম্পাদকীয়

আপনার মনের ভেতরে কী চলছে, জানেন?

কোলাহলের আড়ালে নীরবে কাজ করে আরেকটি জগৎ

তাজা খবর: সারাদিন কত কিছুই না ভাবি আমরা। কাজের চাপ, মোবাইলের নোটিফিকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা কিংবা অতীতের স্মৃতি—মাথার ভেতর যেন অবিরাম চলতেই থাকে চিন্তার ভিড়। কিন্তু এই কোলাহলের আড়ালে নীরবে কাজ করে আরেকটি জগৎ, যার অস্তিত্ব আমরা খুব কমই টের পাই। সেটিই অবচেতন মন।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা সচেতনভাবে যতটা ভাবি, তার বাইরেও মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ নীরবে তথ্য, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা প্রক্রিয়াজাত করতে থাকে। তবে সারাক্ষণ মানসিক ব্যস্ততার কারণে সেই সংকেতগুলো অনেক সময় আমাদের নজরেই আসে না।

নীরবতা মানেই কি শান্তি?

গবেষকদের মতে, বাইরের নীরবতা আর মনের নীরবতা এক বিষয় নয়। অনেকেই হঠাৎ একেবারে নিরিবিলি পরিবেশে গিয়ে অস্বস্তি অনুভব করেন। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত। হঠাৎ সবকিছু শান্ত হয়ে গেলে সেটি সাময়িকভাবে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারে।

তবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এই অস্বস্তি কমে আসে। তখন বাইরের নীরবতা ধীরে ধীরে মনের ভেতরের অস্থিরতাও কমাতে সাহায্য করে।

কেন ধ্যান, প্রার্থনা বা প্রকৃতিতে গেলে ভালো লাগে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধ্যান, প্রার্থনা কিংবা প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকলে সচেতন মনের ব্যস্ততা কিছুটা কমে আসে। তখন স্নায়ুতন্ত্রও তুলনামূলক শান্ত অবস্থায় যায়।

এই সময় মানুষ নিজের অনুভূতি, আবেগ এবং ভেতরের নানা বিষয় আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

এ কারণেই অনেকেই পাহাড়, সমুদ্র কিংবা তারাভরা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি অনুভব করেন। মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘অ’ (Awe)—যেখানে মানুষ নিজেকে বিশাল এক জগতের ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে অনুভব করে।

গবেষকদের মতে, এমন অভিজ্ঞতা মানুষের মনোযোগকে নিজের উদ্বেগ থেকে কিছুটা সরিয়ে বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। ফলে দৈনন্দিন সমস্যাগুলো তুলনামূলক ছোট মনে হতে পারে।

অবচেতন মন কীভাবে কাজ করে?

সচেতন মন মূলত ভাষা, যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাজ করে। অপরদিকে, অবচেতন মন অনুভূতি, স্মৃতি, প্রতীক, চিত্র এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে। এ কারণেই অনেক সময় কোনও অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হলেও একটি ছবি, একটি সুর বা একটি রূপক সেই অনুভূতিকে সহজে প্রকাশ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের অনেক সৃজনশীল চিন্তা, অন্তর্দৃষ্টি কিংবা হঠাৎ কোনও বিষয় বুঝে ওঠার পেছনেও এই অবচেতন মানসিক প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে।

সব উত্তর কি অবচেতন মনেই?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অবচেতন মন কোনও অলৌকিক শক্তি নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

তবে সারাক্ষণ তথ্যের চাপ, শব্দ আর ব্যস্ততার মধ্যে থাকলে সেই প্রক্রিয়াকে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই নিয়মিত কিছু সময় নীরবে বসে থাকা, ধ্যান বা প্রার্থনা করা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া কিংবা নিজের অনুভূতি নিয়ে সচেতনভাবে ভাবার মতো অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি আনতে এবং নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে সহায়ক হতে পারে।

শেষ কথা

জীবনে যেমন বেড়েছে শব্দ, তেমনি বেড়েছে মনের ভেতরের কোলাহলও। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সব প্রশ্নের উত্তর বাইরে খুঁজতে হয় না। কখনও কখনও কয়েক মিনিটের নীরবতা, কিছুটা ধ্যান, প্রার্থনা বা প্রকৃতির সান্নিধ্যই নিজের অনুভূতি ও চিন্তাকে নতুন করে বুঝতে সাহায্য করে। অবচেতন মন অলৌকিক কিছু নয়, তবে নিজেকে বোঝার পথে এটি হতে পারে সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button