সাভারে ফুটপাত ও সড়ক ভাড়া দিয়ে মাসে কোটি টাকা পকেটে পুরছে প্রভাবশালী চক্র
হেমায়েতপুর স্ট্যান্ড এলাকা এবং সংলগ্ন আঞ্চলিক সড়কের একাংশ দখল ও ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকা
তাজা খবর: ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাভারের হেমায়েতপুর স্ট্যান্ড এলাকা এবং সংলগ্ন আঞ্চলিক সড়কের একাংশ দখল ও ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকা অবৈধ আয় করছে এক সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে প্রকাশ্যে ও নীরবে চালানো হচ্ছে এই চাঁদাবাজি। কেবল মহাসড়কই নয়, ফুটপাত সম্পূর্ণ গ্রাস করে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচাবাজার ও অবৈধ দোকানপাট। পাশাপাশি অটোরিকশা ও সিএনজি থেকেও নিয়মিত তোলা হচ্ছে চাঁদা।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ডে আখের রস বিক্রেতা সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আখ ভাঙ্গিয়ে রস বিক্রি করে আর কয়টাকা ইনকাম করি কিন্তু নেতাদের প্রতিদিন ৩শ’ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদার টাকা না দিলে সড়কের আশেপাশে দাঁড়াতেও দেয় না। তবে কাদেরকে টাকা দেন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ভয়ে তাদের নাম বলতে রাজি হয়নি।
একাধিক ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হেমায়েতপুরের ফুটপাত ও সড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ কাঁচাবাজার এবং অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়। এই খাত থেকে টাকা উত্তোলনের মূল দায়িত্বে রয়েছে মুকুল, সাগর, রমজান ও জাকির। তাদের নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলে দোকান তুলে দেওয়ার হুমকিসহ নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
টাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যে মুকুল ২০২৫ সালের ১৭ই আগস্ট রাতে হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ডে কাঁচাবাজার থেকে চাঁদা তোলার সময় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় তিনি একই কাজ করছেন।
এ বিষয়ে জানতে অবৈধ কাঁচাবাজার এবং অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে নিয়মিত টাকা উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা সাগরের মুঠোফোনে ফোন করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে অন্যদের সাথে কথা বলার কোন ফোন নাম্বার পাওয়া যায়নি।
মহাসড়ক ও স্থানীয় সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশা থেকেও প্রকাশ্যে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হচ্ছে। অটোরিকশা খাতের চাঁদাবাজির নেতৃত্বে রয়েছে রফিক, রহিম, রিপনসহ আরও ৪-৫ জনের একটি সক্রিয় দল।
অন্যদিকে, হেমায়েতপুর-কেরানীগঞ্জ এবং হেমায়েতপুর-সিংগাইর আঞ্চলিক সড়কে চলাচলকারী সিএনজিগুলো যখন ‘ঢাকা সিএনজি ফিলিং স্টেশন’-এ গ্যাস নিতে আসে, ঠিক তখনই তাদের ওপর বসে চাঁদাবাজির কোপ। সিএনজিচালকদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা আদায় করে মমিন ও তাজুল নামের দুই ব্যক্তি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিএনজি চালক বলেন, গ্যাস নিতে আসলেই আমাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে সিরিয়াল থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং গাড়ি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হয়। আমরা বাধ্য হয়েই টাকা দিই।
স্থানীয় একাধিক লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মহাসড়ক ও ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীরা। হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে বড় বড় মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলো প্রতিমাসে ক্ষতি গুনছে হকারদের কারণে। ফুটপাতে সব ধরনের পণ্য বিক্রি হওয়ায় খদ্দেররা মার্কেটে প্রবেশ না করে ফুটপাত থেকেই কেনাকাটা করে নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফুটপাতের সাধারণ হকারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ফুটপাতে দোকানভেদে বাসস্ট্যান্ডের কথিত নেতাদের অগ্রিম দিতে হয় ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
দোকানপাট ও পরিবহন খাত থেকে আদায় করা বিপুল পরিমাণ চাঁদার টাকা দিনশেষে গিয়ে জমা হয় সাদ্দাম হোসেন নামের এক ব্যক্তির হাতে। অভিযোগ রয়েছে, সাদ্দাম হোসেন গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত একটি মামলার ১৩৩নং আসামি। তার নির্দেশে অবৈধ টাকার এই সাম্রাজ্য নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
তবে, ফুটপাত কাঁচা বাজার দোকান থেকে টাকা তোলার বিষয় অস্বীকার করে সাদ্দাম হোসেন বলেন, কয়েকদিন পরপরই সাংবাদিকরা এই বিষয় নিয়ে আমাকে ফোন দেয়, তারপরে হঠাৎ দেখি চুপ হয়ে যায়। আমার নাম কে বলছে যে আমি টাকা তুলি তাকে একটু আমাকে দেখিয়ে দেন। অন্য আরো যারা টাকা তুলে তাদেরকেও তিনি চিনেন না বলে জানান। তিনি এই টাকা তোলার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করেন।
স্থানীয়দের মধ্যে জোরালো আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে যে, এই অবৈধ চাঁদাবাজির মোটা অঙ্কের টাকা কেবল চাঁদাবাজদের পকেটেই যায় না; হাইওয়ে পুলিশ এবং ট্যানারি ফাঁড়ি পুলিশের মধ্যেও এর ভাগ বণ্টন হয়। এই কারণেই মহাসড়ক দখল, চরম যানজট এবং সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ সাধারণ জনগণ ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের।
সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ সওগাতুল আলম বলেন, হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ড অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য আমরা একটা পরিকল্পনা করছি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে আলোচনা হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে যে শক্তির প্রয়োজন তা হাইওয়ে পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উত্তোলনকৃত চাঁদার টাকার ভাগ হাইওয়ে পুলিশকে দেওয়া হয় এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সব মিথ্যা। কারা চাঁদা তুলে জানতে পারলে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হবে।
তবে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, হেমায়েতপুর বাস স্ট্যান্ড ফুটপাতে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
হেমায়েতপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অবৈধ চাঁদাবাজি ও দখলের কারণে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকছে। সাধারণ পথচারী ও যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন এই চক্রের কাছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে এই চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত করার জন্য ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এ সব বিষয়ে জানতে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সাইফুল আলমের সাথে কথা বলার জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।



